ঘাটশিলা ভ্রমণ: পাহাড়, নদী আর প্রকৃতির মাঝে এক সুন্দর ছুটির ঠিকানা
শহরের ব্যস্ততা থেকে কয়েক দিনের জন্য একটু দূরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করলে এমন একটি জায়গা দরকার যেখানে খুব বেশি ভিড় নেই, চারপাশে সবুজ প্রকৃতি আছে, আর দিনের শেষে মনটা একটু হালকা হয়ে আসে। ঘাটশিলা ঠিক তেমনই একটি জায়গা।
ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলায় অবস্থিত ঘাটশিলা মূলত সুবর্ণরেখা নদী, পাহাড়, জঙ্গল আর শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত। কলকাতা থেকে খুব বেশি দূরে নয় বলে বাঙালিদের কাছে ঘাটশিলা বেশ জনপ্রিয় একটি ভ্রমণস্থান। একদিনের ছোট্ট ঘোরাঘুরি থেকে শুরু করে দু-তিন দিনের ছুটির পরিকল্পনা—দুই ক্ষেত্রেই জায়গাটি বেশ ভালো।
বিশেষ করে যারা খুব বেশি ভিড় বা ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্র পছন্দ করেন না, তাদের কাছে ঘাটশিলার স্বাভাবিক পরিবেশ বেশ ভালো লাগতে পারে।
| Ghatshila |
ঘাটশিলা কোথায়?
ঘাটশিলা ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার একটি শহর। সুবর্ণরেখা নদী এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। নদী, পাহাড় এবং জঙ্গলের মিলিত পরিবেশ ঘাটশিলাকে অন্যরকম সৌন্দর্য দিয়েছে।
ঘাটশিলা শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এর সঙ্গে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও একটি বিশেষ যোগ রয়েছে। কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতির সঙ্গে এই এলাকার নাম জড়িয়ে আছে। তাই প্রকৃতিপ্রেমীদের পাশাপাশি সাহিত্যপ্রেমীদের কাছেও ঘাটশিলার আলাদা আকর্ষণ রয়েছে।
ঘাটশিলা যাওয়ার সেরা সময়
ঘাটশিলা ভ্রমণের জন্য শীতকালকে অনেকেই সবচেয়ে আরামদায়ক সময় হিসেবে বেছে নেন। অক্টোবর থেকে মার্চের মধ্যে আবহাওয়া সাধারণত ঘোরাঘুরির জন্য স্বস্তিদায়ক থাকে।
শীতের সকালে নদীর ধারে বসে থাকা কিংবা সবুজ পাহাড়ের রাস্তা ধরে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা বেশ সুন্দর। দিনের তাপমাত্রাও তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক থাকে।
বর্ষাকালে ঘাটশিলার প্রকৃতি আরও সবুজ হয়ে ওঠে। তবে বৃষ্টির কারণে রাস্তা বা কিছু দর্শনীয় জায়গায় ঘোরাঘুরি কিছুটা অসুবিধাজনক হতে পারে। তাই বর্ষায় গেলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে পরিকল্পনা করা ভালো।
গ্রীষ্মকালে দিনের বেলায় গরম বেশি থাকতে পারে। তাই সেই সময়ে ঘুরতে গেলে সকাল বা বিকেলের সময়টা কাজে লাগানো সুবিধাজনক।
ঘাটশিলায় কী কী দেখবেন?
ঘাটশিলা ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এখানে প্রকৃতির কাছাকাছি বেশ কিছু জায়গা একসঙ্গে দেখা যায়। খুব দ্রুত সব জায়গা ঘুরে ফেলার বদলে সময় নিয়ে ঘুরলে ভ্রমণের আনন্দ আরও বেশি পাওয়া যায়।
১. সুবর্ণরেখা নদী
ঘাটশিলার কথা উঠলে প্রথমেই সুবর্ণরেখা নদীর কথা মনে আসে। নদীর শান্ত পরিবেশ এবং চারপাশের সবুজ প্রকৃতি অনেকক্ষণ বসে থাকার মতো।
সকালে বা বিকেলের দিকে নদীর কাছে গেলে পরিবেশটা আরও সুন্দর লাগে। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা কিংবা শুধু চারপাশের প্রকৃতি উপভোগ করাও ঘাটশিলা ভ্রমণের অন্যতম আনন্দ।
তবে নদীর জলে নামার আগে স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে নেওয়া উচিত। বর্ষাকালে নদীর জলস্তর ও স্রোত অনেকটাই পরিবর্তিত হতে পারে।
২. ধারাগিরি জলপ্রপাত
ঘাটশিলার আশেপাশে ঘোরার সময় ধারাগিরি জলপ্রপাত দেখা যেতে পারে। বর্ষা এবং বর্ষার পর প্রকৃতির সৌন্দর্য এখানে বিশেষভাবে চোখে পড়ে।
জলপ্রপাতের আশেপাশের সবুজ পরিবেশ জায়গাটিকে বেশ মনোরম করে তুলেছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য এটি ভালো একটি জায়গা।
তবে পাথুরে জায়গায় হাঁটার সময় সাবধানে চলা উচিত, বিশেষ করে বৃষ্টির পরে পাথর ভিজে থাকলে পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৩. ফুলডুংরি পাহাড়
ঘাটশিলার অন্যতম পরিচিত জায়গা ফুলডুংরি পাহাড়। খুব বেশি উঁচু পাহাড় না হলেও এখানকার পরিবেশ এবং উপর থেকে চারপাশের দৃশ্য বেশ ভালো লাগে।
সকাল কিংবা বিকেলের দিকে এখানে গেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি সুন্দর কিছু ছবি তোলা যায়।
পাহাড়ে ওঠার সময় আরামদায়ক জুতো পরা ভালো। বর্ষাকালে রাস্তা পিচ্ছিল হতে পারে, তাই অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
৪. বুরুডি লেক
ঘাটশিলার কাছাকাছি বুরুডি লেকও একটি জনপ্রিয় আকর্ষণ। পাহাড় ঘেরা জলাধারের পরিবেশ বেশ শান্ত এবং মনোরম।
লেকের চারপাশে বসে প্রকৃতি উপভোগ করা যায়। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে গেলে এখানে কিছুটা সময় কাটাতে ভালো লাগবে।
তবে যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জায়গাটি খোলা আছে কি না এবং কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা সময়সূচি রয়েছে কি না জেনে নেওয়া ভালো।
৫. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘাটশিলার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রকৃতির যে সহজ-সরল সৌন্দর্য দেখা যায়, ঘাটশিলার পরিবেশের সঙ্গে তার একটা অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
সাহিত্যপ্রেমী হলে ঘাটশিলায় গিয়ে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে পারেন। এতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একটা আলাদা সাংস্কৃতিক মাত্রা যোগ হয়।
ঘাটশিলা ভ্রমণে কতদিন লাগবে?
ঘাটশিলা ভালোভাবে ঘুরে দেখতে চাইলে অন্তত দুই দিন সময় হাতে রাখা সুবিধাজনক। এতে তাড়াহুড়ো না করে বিভিন্ন জায়গায় সময় দেওয়া যায়।
একদিনের জন্য গেলে কাছাকাছি কয়েকটি জায়গা বেছে নিয়ে ঘোরা ভালো। আর দু-তিন দিনের পরিকল্পনা করলে আশেপাশের আরও কিছু জায়গা ঘুরে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।
আমার মতে, ঘাটশিলার মতো জায়গায় ভ্রমণের আসল আনন্দ হলো একটু ধীরে ঘোরা। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় শুধু ছুটে বেড়ানোর বদলে কোথাও বসে নদী দেখা, পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা বা বিকেলের আলো উপভোগ করাও ভ্রমণের অংশ।
কলকাতা থেকে ঘাটশিলা কীভাবে যাবেন?
কলকাতা থেকে ঘাটশিলা যাওয়ার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়গুলোর একটি হলো ট্রেন। হাওড়া থেকে টাটানগর বা ওই রুটের বিভিন্ন ট্রেন পাওয়া যায়, যেগুলোর মধ্যে কিছু ট্রেন ঘাটশিলা স্টেশনে থামে।
তবে ট্রেনের সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাত্রার আগে বর্তমান রেলওয়ে সময়সূচি দেখে টিকিট বুক করা ভালো।
নিজস্ব গাড়ি বা ভাড়া করা গাড়িতেও কলকাতা থেকে ঘাটশিলা যাওয়া যায়। সড়কপথে গেলে নিজের মতো করে পথে বিভিন্ন জায়গায় থামার সুবিধা থাকে।
ঘাটশিলায় কোথায় থাকবেন?
ঘাটশিলায় বিভিন্ন ধরনের থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায়। বাজেট অনুযায়ী হোটেল, গেস্টহাউস বা অন্যান্য থাকার জায়গা বেছে নেওয়া যায়।
ছুটির মরশুমে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই থাকার জায়গা বুক করে রাখা ভালো। বিশেষ করে সপ্তাহান্তে বা দীর্ঘ ছুটির সময়ে ভালো থাকার জায়গা পাওয়া কঠিন হতে পারে।
হোটেল বুক করার আগে লোকেশন, খাবারের ব্যবস্থা, পার্কিং এবং কাছাকাছি দর্শনীয় জায়গাগুলোর দূরত্ব দেখে নেওয়া সুবিধাজনক।
ঘাটশিলা ভ্রমণে কী খাবেন?
ভ্রমণে গিয়ে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়াটাও একটা মজার ব্যাপার। ঘাটশিলা ও আশেপাশের এলাকায় সাধারণ বাঙালি খাবারের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু খাবারও পাওয়া যায়।
তবে নির্দিষ্ট কোনো রেস্তোরাঁয় যাওয়ার আগে সাম্প্রতিক রিভিউ বা স্থানীয়দের পরামর্শ নেওয়া ভালো। ছোট শহরের খাবারের দোকানগুলোর সময়সূচিও সবসময় একরকম নাও হতে পারে।
ঘাটশিলা ভ্রমণের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় টিপস
ঘাটশিলা যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলে ভ্রমণটা আরও আরামদায়ক হতে পারে।
১. আবহাওয়া দেখে যান: বর্ষায় গেলে বৃষ্টির প্রস্তুতি রাখুন এবং শীতে হালকা গরম পোশাক সঙ্গে রাখুন।
২. আরামদায়ক জুতো পরুন: পাহাড়ি ও পাথুরে জায়গায় হাঁটতে হতে পারে।
৩. পর্যাপ্ত পানি রাখুন: বিশেষ করে গরমকালে ঘোরার সময় সঙ্গে পানীয় জল রাখা ভালো।
৪. স্থানীয় নিয়ম মেনে চলুন: বনাঞ্চল, নদী বা জলপ্রপাতের এলাকায় স্থানীয় নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।
৫. প্রকৃতি নোংরা করবেন না: প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট বা অন্যান্য আবর্জনা যেখানে-সেখানে ফেলে আসবেন না।
৬. সন্ধ্যার পর অপরিচিত জায়গায় একা ঘোরাঘুরি এড়িয়ে চলুন: নতুন জায়গায় স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা ভালো।
ঘাটশিলা কি পরিবার নিয়ে যাওয়ার জন্য ভালো?
পরিবার, বন্ধু কিংবা দু-একজন মিলে ছোট ট্রিপ—সব ক্ষেত্রেই ঘাটশিলা ভ্রমণ করা যায়। তবে ভ্রমণের ধরন অনুযায়ী জায়গা বেছে নেওয়া উচিত।
পরিবারের সঙ্গে গেলে নদী, লেক এবং অপেক্ষাকৃত সহজে যাওয়া যায় এমন জায়গাগুলোতে বেশি সময় দিতে পারেন। আর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গেলে পাহাড়, জঙ্গল ও আশেপাশের জায়গাগুলো একটু বেশি ঘুরে দেখা যায়।
বয়স্ক মানুষ বা ছোট শিশু সঙ্গে থাকলে দুর্গম জায়গায় যাওয়ার আগে রাস্তা এবং স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া ভালো।